কোলেস্টেরল


ভালো কোলেস্টেরল কি আর খারাপ কোলেস্টেরলই বা কাকে বলে?

কোলেস্টেরল কী? কোলেস্টেরল এক ধরনের চর্বি। এটি কয়েক ধরনের হয়ে থাকে ট্রাইগ্লিসারাইড, এলডিএল, এইচডিএল এবং টোটাল কোলেস্টরল। এর মধ্যে একটা হলো উপকারী। আর তিনটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর।এই কোলেস্টেরল জমা হয় রক্তনালিতে। জমা হতে হতে রক্তনালির স্বাভাবিক যে রক্তস্রোত তা বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যেকোনো রক্তনালিকে আক্রান্ত করতে পারে, মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করতে পারে, লিম্বস আক্রান্ত করতে পারে, ব্লক করতে পারে।হার্টে হয় তো হার্ট অ্যাটাক হলো, যদি লিম্বসে হয় তাহলে হাঁটতে অসুবিধা হবে। মস্তিষ্কে হলে স্ট্রোক হতে পারে।আমাদের খাদ্যাভ্যাসের কারণে। আর এমন জীবন যাপন যদি করেন, বেশি শুয়ে বসে থাকা। তারপর কিছু অভ্যাস আছে যেমন ধূমপান, মদ্যপান, জর্দা সেবন এসব কারণে হয়। আর কিছু রোগ রয়েছে এটার জন্য দায়ী ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ইত্যাদি। আর কিছু ওষুধ আছে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। 


আমরা মানুষেরা খুব স্বার্থপর জানেন তো, নিজেদের স্বার্থের ওপর ভিত্তি করেই সব ভালো-খারাপের বিচার বিবেচনা করি। আর এই লাইপোপ্রোটিনের শ্রেণীবিভাগ এর ক্ষেত্রেও কিন্তু তার ব্যত্যয় ঘটেনি। কোলেস্টেরলের খারাপ আর ভালোর শ্রেণীবিভাগ ঘটেছে আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষার কথা বিবেচনা করেই, আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ(CVD) ঘটানোর প্রবণতার ওপর ভিত্তি করে। লাইপোপ্রোটিন কিন্তু বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন—

  • লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (LDL)
  • ভেরি লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (VLDL)
  • কাইলোমাইক্রন (CM)
  • ইন্টারমিডিয়েট ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (IDL)
  • হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (HDL)

এবার ঘটনা হল এই পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে আমরা একমাত্র HDL বা হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন-কেই ভালো কোলেস্টেরল বলে থাকি। কেন ভালো বলি? তার কারণ—

এই HDL ই রক্তবাহে প্রবাহিত কোলেস্টেরলকে ধমনী থেকে লিভারে পৌঁছে দেয়, যার মাধ্যমে কোলেস্টেরল শরীরে ব্যবহৃত হতে পারে কিংবা রেচনতন্ত্রের মাধ্যমে বাইরে নির্গত হতে পারে।
এছাড়াও উচ্চমাত্রার HDL এ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি প্রভাব আছে এবং একই সাথে হৃদরোগের সম্ভাবনা কমিয়ে আনতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।[1]
আর সে কারণেই গবেষকদের মতে শরীরে এইচডিএলের মাত্রা পুরুষদের ক্ষেত্রে কমপক্ষে 40 mg/dL আর নারীদের ক্ষেত্রে কমপক্ষে 50 mg/dL হওয়া প্রয়োজন। এই মাত্রা 60 mg/dL এর ওপরে থাকা হৃদরোগ প্রতিরোধে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। তবে উল্টোদিকে এই মাত্রাই যদি 40 mg/dL এর নিচে নেমে যায়, তবে যথেষ্ট ঝুঁকি বেড়ে যায় করোনারি আর্টারি ডিজিজ (CAD) এ আক্রান্ত হওয়ার। এই ভালো কোলেস্টেরলের প্রতি 1mg/dL মাত্রার পতনে হৃদরোগের ঝুঁকি 3 শতাংশ করে বৃদ্ধি পায়।

তবে মনে রাখতে হবে, শুধুমাত্র ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ালেই চলে না, উল্টোদিকে তথাকথিত খারাপ কোলেস্টেরলকেও নির্ধারিত মাত্রার নিচে রাখতে হয়। মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা (Total Cholesterol) 200 mg/dL এর নিচে থাকা তো আবশ্যক, তবে 180 এর নিচে থাকাটাই অভিপ্রেত। এরমধ্যে LDL কোলেস্টেরলের মাত্রা 100 এর নিচে এবং non- HDL কোলেস্টেরলের মাত্রা 130 এর নিচে থাকলে হৃদরোগের কোন ধরনের ঝুঁকি থাকে না। কিন্তু HDL কোলেস্টেরলের মাত্রা যত কমতে থাকে এবং non-HDL কোলেস্টেরলের মাত্রা যত বাড়তে থাকে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ(CVD) এর ঝুঁকি তত বাড়তে থাকে। এই এই ঝুঁকির মাত্রা নিচের ছকের মাধ্যমে খুব সহজে বোঝা যায়—

সুতরাং আমাদের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে দৈনিক কার্যক্রম এমন হওয়া উচিত যাতে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ মাত্রার ওপরে থাকে এবং খারাপ কোলেস্টেরল তথা non-HDL এর পরিমাণ সব সময় মাত্রার নিচে অবস্থান করে। সেজন্য শুধু খাদ্যতালিকায় নতুন খাবার যোগ করলেই চলবে না, খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে দৈনন্দিন অভ্যেসে আনতে হবে ব্যাপক পরিবর্তন। কি সেই পরিবর্তন? আসছি তাদের আলোচনায়—

গ্রহণ করুন ভেজিটেবল অয়েল ও পুফা (PUFA): বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ তেলে যেমন সূর্যমুখী তেলে প্রচুর পরিমাণে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড (PUFA) থাকে। কোলেস্টেরল এস্টারিফিকেশন এবং তাদের নির্গমনে পুফা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাছাড়া মাছের তেলেও প্রচুর পরিমাণে ওমেগা 3 ফ্যাটি এসিড থাকে যা এলডিএলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সে কারণেই প্রতিদিন 1 গ্রাম করে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড বা মাছের তেল গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়।

অতিরিক্ত পুফা নয়: পুফা কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে বটে, কিন্তু এক্ষেত্রে একটা বিষয়ে লক্ষ রাখা দরকার। পুফা তে শুধুমাত্র ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিডই থাকে না, তার সাথে থাকে ওমেগা 6 ফ্যাটি এসিড। অতি উচ্চ মাত্রায় ওমেগা 6 ফ্যাটি এসিড গ্রহণ করলে শরীরে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা কমতে থাকে, উল্টোদিকে বাড়তে থাকে প্লাসমা ট্রাই গ্লিসারাইড আর খারাপ কোলেস্টেরল এর মাত্রা। আমাদের ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসের দানাশস্য জাতীয় খাবার এবং শাকসবজিতে যে পরিমাণে পুফা আছে, সেই 'অদৃশ্য তেল' দৈনিক 10 গ্রামের বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

সূর্যমুখী তেলের চেয়েও নারকেল তেল ভালো: ওমেগা 6 এবং ওমেগা 3 ফ্যাটি এসিড এর অনুপাত 4:1 হওয়া আদর্শ। সেই জায়গায় আমাদের ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসে এর অনুপাত 30:1. সূর্যমুখী তেলের অনুপাত গিয়ে দাঁড়ায় 160:1. তাই অতিরিক্ত পরিমাণে সূর্যমুখী তেলের গ্রহণ, আপনার শরীরের অবস্থা ভালোর পরিবর্তে আরো খারাপ করে দিতে পারে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নারকেল তেলে এই অনুপাত কিন্তু 3:1. কাজেই ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে আর খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমাতে নারকেল তেল কিন্তু সূর্যমুখী তেলের চেয়েও বেশি উপযোগী।

গ্রহণ করুন সবুজ পাতা যুক্ত শাকসবজি : সবুজ পাতা যুক্ত শাকসবজিতে উচ্চমাত্রায় ফাইবার থাকে যা পরিপাকতন্ত্রের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও শাক-সবজিতে প্রচুর পরিমাণে প্লান্ট স্টেরল (sitosterol) থাকে যা কোলেস্টেরলের শোষণে বাধা দেয়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় গড়ে 400 গ্রাম ফলমূল ও শাকসবজি থাকা আবশ্যক।
এড়িয়ে চলুন ট্রান্স ফ্যাটি এসিড: বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ তেলের পার্শিয়াল হাইড্রোজেনেশন এর মাধ্যমে উৎপন্ন হয় ট্রান্স ফ্যাটি এসিড। প্রাকৃতিক ভাবে প্রাপ্ত প্রাণিজ ফ্যাট ছাড়াও কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাটি এসিড যেমন— মার্জারিন বা প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকেও ক্ষতি হতে পারে। রক্তে এইচডিএলের মাত্রা হ্রাস করতে এবং এলডিএলের মাত্রা বৃদ্ধি করতে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড বিশেষ ভূমিকা পালন করে। দিনে 2-3 গ্রামের বেশি ট্রান্স ফ্যাটি এসিড গ্রহণ করা মোটেই উচিত কাজ নয়।

খেয়াল রাখুন দৈনন্দিন খাবারে : সত্যি বলতে দৈনন্দিন খাবারে কোলেস্টেরল কম গ্রহণ করলেও যকৃত নিজে থেকেই বিভিন্ন জৈবিক বিক্রিয়া ঘটনার মাধ্যমে আবার কোলেস্টেরল উৎপাদিত করে। তাই আজকাল ডায়েটারি কোলেস্টেরলকে হৃদরোগের প্রধানতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কিন্তু তবুও খেয়াল রাখবেন দৈনন্দিন কোলেস্টেরল গ্রহণ যেন সবসময় 200 মিলিগ্রাম এর নিচে থাকে। কেননা ডিম এবং মাংসের মধ্যেও কিন্তু প্রচুর পরিমাণে কোলেস্টেরল থাকে। এমনকি একটি ডিমের কুসুমেও 500 মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে!

ধূমপান ছাড়ুন যত দ্রুত সম্ভব : শরীরে করোনারি আর্টারি ডিজিজ (CAD) এর ঝুঁকি বৃদ্ধিতে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা নেয় ধূমপান। 1 বছর ধরে দেড় হাজার মানুষের ওপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে সমস্ত মানুষেরা ধূমপান করা ছেড়ে দিয়েছেন তাদের রক্তে HDL এর মাত্রা অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যারা ধূমপান করা ছাড়েনি।

খাবারে কমান সুক্রোজ: উচ্চ শর্করাযুক্ত খাদ্য বিশেষ করে সুক্রোজ বেশি গ্রহণ করা উচিত নয়। কারণ সুক্রোজ প্লাসমা ট্রাই গ্লিসারাইড এর মাত্রা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উচ্চমাত্রায় সুক্রোজ গ্রহণ করার ফলে হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
সুস্থ থাকতে নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: নতুন করে কিছুই বলার নেই এখানে। তবে খুব ভারিক্কি ধরনের শরীরচর্চা করার দরকার নেই। রোজ অল্পবিস্তর ব্যায়াম, আর প্রতিদিন আধ ঘন্টা হাঁটাই যথেষ্ট। এতে করে শরীরে HDL এর পরিমাণও বাড়বে আবার LDL ও মাত্রার নিচে থাকবে। প্রত্যহ 2000 কিলোক্যালোরি ঝরালে মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসনের সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। যে যে ব্যক্তি দিনে 1.5 কিলোমিটার হাঁটে তার অন্যদের তুলনায় কার্ডিওভাসকুলার মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা 2.6 গুণ কম থাকে।

হাইপোলিপিডেমিক ড্রাগ : এতসব কিছুর পরেও অনেক সময় রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে না, ফলে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজে ব্যক্তি আক্রান্ত হয়। এর পেছনে জেনেটিক কারণ, ডায়াবেটিস মেলিটাস, রেটিনোপ্যাথি, নেফ্রোপ্যাথি সহ আরো বহু কারণ থাকতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে, তাঁর পরামর্শ মতো হাইপোলিপিডেমিক ড্রাগ গ্রহণ করা হয়। তবে টোটাল কোলেস্টেরল এর মাত্রা 220 mg/dL অতিক্রম করলেই সাধারণত চিকিৎসক এজাতীয় ড্রাগ গ্রহণ করতে পরামর্শ দেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্ট্যাটিন ব্যবহৃত হয়। তবে এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে কারো কারো ক্ষেত্রে। অন্যান্য ড্রাগের মধ্যে ফাইব্রেট, নিয়াসিন, কোলেস্টাইরামাইন, এজেটিমাইডও প্রেস্ক্রাইব করতে দেখা যায়। রোগীর দেহে লাইপোপ্রোটিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এদের প্রভাব নিচের ছক দেখে বুঝতে পারা যায়।



পরিশেষে এটাই বলবো, আজকাল 90 শতাংশ ক্ষেত্রেই যেহেতু CAD পূর্ব নির্ধারণ করা যায়, আবার সহজে প্রতিরোধও করা যায়, তাই এই নিয়ে খুব একটা চিন্তার কোনো জায়গা নেই। স্বাভাবিক জীবনচর্যাতেই সামান্য পরিবর্তন এনে শরীর সুস্থ রাখা যায়। খাদ্যাভ্যাসে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ানো এই পরিবর্তনেরই অংশ। তবে খারাপ অভ্যেসগুলোতে পরিবর্তন আনা বোধ হয় তার চেয়েও বেশি জরুরি। ধূমপান থেকে দূরে থাকুন, নিয়মিত হাঁটাচলার অভ্যেস গড়ে তুলুন।

ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সুস্থ রাখুন সবাইকে :)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

dnt share any link

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম